নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন; ডিআইইউ শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার যৌথ আন্দোলন উপহার দিয়েছে একটি নতুন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক অর্জনের পর থেকেই দেশের প্রতিটি মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে—একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশের।
২০২৪ সালের নানা চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা কেমন? নতুন বাংলাদেশ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথাগুলো তুলে ধরেছেন দেশদেশান্তর২৪ এর প্রতিবেদক নুর ইসলাম।
সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা-
জুলাই-আগষ্ট অভ্যূস্থানের পর আমাদের চাওয়া দেশকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেয়া। আমরা বাংলাদেশের একটি গঠনমূলক সংস্কার চাই। ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেনো তাদের জনগনের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক খাতকে দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। অতিদ্রুত বিচার বিভাগের অবকাঠামো সংস্কার করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। আমরা সবাই এমন একটি দেশ চাই যেখানে ধর্মের কেনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাই নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে। নতুন বাংলাদেশকে আমরা স্বাবলম্বী হিসেবে দেখতে চাই। এছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতির অবসান ঘটাতে হবে। যেখানে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জায়গা থাকবে।
মো. মোস্তফা কামাল,
শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
আইন সংস্কার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা-
২৪ এর গণবিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে এবং নতুন এক সম্ভাবনার বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে আইন সংস্কার সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমি মনে করি, দেশের সকল প্রশাসনিক ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না রেখে প্রশাসনিক ক্ষমতার ডিস্ট্রিবিউশন করা দরকার। এছাড়া সংবিধানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সর্বোপরি নতুন বাংলাদেশে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখতে পারলে দেশ সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পাবে বলে আমি মনে করি।
শাকিল আহমেদ,
সভাপতি, ডিআইইউ ‘ল’ ক্লাব।
বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থাপনা-
হাজারো ছাত্র-জনতার জীবনের বিনিময়ে, হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্বববন ও অঙ্গ হানির মাধ্যমে আমরা পেয়েছি নতুন বাংলাদেশ। তাই এত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই নতুন প্রজন্মের নতুন দেশকে নিয়ে প্রত্যাশাও বেশি। আমরা চাই দেশের প্রতিটি নাগরিক তার যথাযথ অধিকার নিয়ে সম্মানের সাথে দেশে বসবাস করবেন। যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। দেশের ভবিষ্যত যেহেতু ছাত্র সমাজ তাই তাদেরকে সততা, মানবিকতা ও নৈতিক গুনাবলি সম্পন্ন দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। কারন আমি বিশ্বাস করি তেঁতুল গাছ লাগিয়ে যেমন আমের আশা করা যায় না, বড়ই গাছ লাগিয়ে যেমন কাঁঠালের আশা করা যায় না তেমনি অসৎ, অযোগ্য, চরিত্রহীন মানুষ দিয়েও একটি সুন্দর, সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়া সম্ভব না। তাই এদেশের ছাত্র সমাজকে এ দেশের হাল ধরতে হবে। তাদেরকে সৎ, যোগ্য ও নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে, পরিবারকে, সমাজ এবং দেশকে গড়ে তুলতে হবে। কারন দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার আগে দুর্নীতিমুক্ত মানুষ গড়তে হবে। অসৎ ব্যক্তিদের দিয়ে কখনোই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আমরা যদি বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্ম-কে এই সকল মানবিক গুণসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলেই কেবল একটি সুন্দর সুখী সমৃদ্ধ দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
মো. শামীম মাতুব্বর,
শিক্ষার্থী ও সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ফোরাম।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি-
নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশ কখনোই ভালো কোন অবস্থানে যেতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারকে বিশেষ জোর দিতে হবে। শিল্পায়ন এবং উৎপাদন খাতের প্রসার ঘটানো, কর্মসংস্থান তৈরির জন্য বিভিন্ন টেকসই উদ্যোগ নেয়া, প্রযুক্তি শিক্ষা তরুণদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং অটোমেশনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া৷ ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্ম এবং উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্প তৈরি করার ব্যবস্থা করা, কৃষি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আওতায় আনা। এছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি খাত আধুনিকীকরণ জরুরি। স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন, আইওটি, স্যাটেলাইট ইমেজিং ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করা। এছাড়া বিদেশীদের বিনিয়োগে আকর্ষণ করানো ও ব্যবসা সহজকরন, বৈদেশিক শ্রমবাজারের উন্নয়ন, বাস্তবায়ন, রেমিট্যান্স খাতে করছাড়, প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উন্নয়নে জোর দেয়া সহ কর ব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে।
হাসিব রায়হান খান,
সহ-সভাপতি, ডিআইইউ ইমার্জিং ইকোনোমিস্টস ফোরাম।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা-
বাংলাদেশে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মমুখী শিক্ষাপদ্ধতি প্রয়োজন। আমাদের দেশকে আধুনিক করতে পাঠ্যক্রমগুলো বিশ্বমানের করতে হবে, যা গুণগত শিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীলতা ও সমস্যার সমাধানের দক্ষতা তৈরি করবে। এছাড়া প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং ও রোবোটিক্স শেখানো জরুরি। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি মাতৃভাষার ভিত্তিতে শিক্ষা চালু রেখে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সমতা নিশ্চিত করে নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। আবার পর্যাপ্ত তহবিল, গবেষণা সুবিধা ও শিক্ষার ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার মডেল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এরমধ্যে নৈতিকতা, পরিবেশ সচেতনতা ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ, নৈতিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
আহনাব মুনতাসীর,
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ডিআইইউ।
কেএ